ফিল্ম রিভিউঃ স্নোপারচার

(Comments)

ফিল্ম রিভিউঃ “স্নোপারচার” (ব্যাং জন – হো,২০১৩)

images

“স্নোপারচার” (ব্যাং জন–হো,২০১৩) হলো দক্ষিন কোরিয়ান সাই-ফাই এর একটি ফিল্ম। এতে ভবিষ্যৎ  তোলেধরার  প্রায়াস থাকলে ও আগামীতে মানুষের সম্ভাব্য দুঃখ কষ্টকে অবজ্ঞা করা হয় নাই । “স্নোপারচার” ইহা আসলে একটি কল্প- বিজ্ঞান । এতে অন্যায় সংক্রান্ত বেশ কিছু অতিরঞ্জনের প্রায়স আছে ।  সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত ফিল্ম “ডিস্ট্রিক – ৯” ও ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। “ফিউচার অব ম্যান” এ দেখানো হয়েছে কি ভাবে মানুষকে অমানবিক করে তোলে ধরা হয়েছে। “এলাইসিয়ামে” মানুষের জীবন যাত্রার চিত্র ফোটে উঠেছে। এই সকল বিষয়াদি আরো লিখা হয়েছে “১৯৮৪”, “ভ্রেইব নিউ ওয়র্ল্ড” এবং “ফরেন হাইট ৪৫১” ইত্যাদিতে। “স্নোপারচার” এর ভিত্তি হলো ফ্রান্সের উপন্যাস Le Transperceneige by Jacques Lob and Jean-Marc Rochette.

“স্নোপারচার” এর জগতে বিশ্ব উষনায়নকে ভিন্নভাবে ও ভূল ভাবে হাজির করা হয়েছে। বলা হয়েছে সমগ্র বিশ্বে বরফের রাজত্ব কায়েম হবে। সেই বিপদাপন্ন পরিস্থিতিতে যারা বেচে থাকবেন তারা উইলফোর্ড কোম্পনির রেলগাড়ীতে করে বেচে থাকবেন। যা সারা দুনিয়াকে একবার বছরে ঘুরে আসবে।  আর সেই রেলগাড়িটি হলো  মি. উইলফোর্ডের চিন্তার ফসল। উইলফোর্ড কোম্পানীর প্রচারনা হিসাবে জনগণের নিকট এই ধরনের গল্প উপস্থাপন করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো জনগণের মাঝে নিজ কোম্পানীকে জনপ্রীয় করে তোলা। তবে দুনিয়ার মানুষ এত বোকা নয় যে তারা তাদের কথা মেনে নিবে। দর্শকরা এই ছিবিটির প্রসংশা করেছে মি. ফোর্ডের কথা শোনে নয় বরং তারা জানে যে বিশ্ব ধংসের দিকে দাবিত হচ্ছে।  জনগণ যে সকল বিষয়ে প্রশংসা সূচক  কথা বলছেন তা সেই রেলগাড়ির পরিবেশ,  অনুকূল পরিস্থিতি সম্পর্কে। ধনিক শ্রেনীর যাত্রীরা থাকবেন গাড়ীর সামনের দিকে আর পিছনের দিকে থাকবে দরিদ্র শ্রেনীর যাত্রী। এই বিষয়টিকে স্বাভাবিক ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গরীবেরা কস্ট করবেন আর ধনিক শ্রেনীর সেবায় নিয়জিত থাকবে তারা। তা ই স্বাভাবিক ভাবে হাজির করা হয়েছে। সর্বাবস্থায় এটাই যেন মানুষের নিয়তি।

নির্মমতার একটি উদাহরন হলো, রেলগাড়ীর  দরিদ্র মানুষের মধ্য থেকে একজন একটি  জুতা ছোড়ে মারল ধনীদের প্রতি, অর্থাৎ যেভাবে ইরাকের সাংবাদিক  মি. বুস কে জুতা মেরেছিলেন, তখন তাকে অত্যন্ত নির্মম ভাবে শাস্তি দেয়া হলো। শাস্তি দান কারী ব্যাক্তি সেই জুতা নিক্ষেপ কারী লোকটির হাত গাড়ীর বাইরে জোর করে প্রচন্ড ঠান্ডায় ধরে রাখল যেন তা কঠিন বরফে পরিনত হয়। যখন তার হাতটি বরফে পরিনত হলো তখন রেলগাড়ির নিরাপত্তা কর্মী একটি লোহার হ্যামার দিয়ে তার হাতটি ভেঙ্গে দিল। সকল যাত্রীদের সামনেই ঘটনাটি ঘটালো যেন সকলেই এ থেকে শিক্ষা নেয়, মূখ বন্দ্ব রাখে আর নিজেদের জুতা নিজেদের পায়েই  পড়ে রাখে। কোম্পানীর প্রচারনা বিভাগের ডিপোটি মিনিষ্টার মেশন (টিলদা সুইন্টন) এই ধানবিক শাস্তির যথার্থতা প্রমানের করেন। তিনি জুতাটি হাতে নিয়ে তোলে ধরে বললেনঃ

“ যাত্রীগন… ইহা অত্যন্ত দুঃখের বিষয় । ইহা কেবল একটি জুতা নয়। ইহা হলো অরাজকতা। ইহা দশ রকমের জগড়ার সৃজন করেছে। দেখুন, এটা দেখুন ? এটা মৃত্যু। আমরা এই রেলগাড়িটিকে আমাদের বাড়ী বলছি, কিন্তু ইহা আমাদের সুন্দর সম্পর্কের মাঝে একটি তিক্ততার সৃজন করেছে। কাপড় ? জিন্স ? তা কিছু করেনি। দলাদলি করবেন না, নইলে তা আমাদেরকে হিমশীতল মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাবে। আমাদের সকলের জীবনই এই রেলগাড়ির সাথে জড়িয়ে পড়েছে, আমাদের গন্তব্য ও নির্ধারিত আছে। আমরা অবশ্যই একে অন্যের স্থান দখল করব না । আপনারা কি নিজেদের জুতা আপনাদের মাথায় পড়বেন ? অবশ্যই আপনারা তা করবেন না । জুতা তো পায়ের জন্যই। আর টুপি হলো মাথার জন্য। আমি হলাম গিয়ে টুপি। আর আপনারা হলেন জুতা। আমার স্থান হলো মাথায় । আর আপনাদের স্থান হলো পায়ে। হ্যা, এটাই সত্যি। ইহা তো সূচনাতেই নির্ধারিত হয়ে আছে। আমরা যখন টিকেট কেটেছি তখন থেকেই তা ঠিক হয়ে গেছে। প্রথম শ্রেনী, সুভন ও সুলভ এই ভাবে। এই পবিত্র রেলগাড়ীর বিধান তো এটাই। পবিত্র গাড়ীতেই এই বিধানে উৎপত্তি। তা যথাযথ ভাবে অনুসরন করা হয়। প্রত্যেক যাত্রী স্ব স্ব স্থানে আছেন। পানি প্রবাহিত হচ্ছে, তাপ উৎপাদন হচ্ছে, সকল কিছুই ইঞ্জিন নিয়ন্ত্রিত। প্রতিটি জিনিষ স্ব স্ব স্থানে বিদ্যমান। এই ভাবেই চলছে। যেমন ছিলো সুচনায়। আমই আছি সামনের দিকে। তোমরা আছো পেছন দিকে। যখনই পা মাথার দিকে যেতে চায় তখনই তা পবিত্র লাইন লঙ্গন করে। তুমি তোমার অবস্থান জান। নিজের স্থানেই থাক। জুতা হিসাবে থাক”।

দারিদ্রতা ও স্পর্ধা মানুষের মাঝে ক্ষোভ তৈরী করে। আমরা বুঝতে পারলাম যে, রেলগারীর পেছনের দিকে মানুষের মাঝে মারাত্মক বিদ্রোহের সৃজন করেছে। মহান মার্কস একটি দৃঢ় সিদ্বান্তে উপনিত হয়েছিলেন যে, পুঁজিবাদ নিজেই নিজের কবর নির্মান করছে, নিপিড়ন রেলগাড়ির পেছিনের দিকে প্রতিরোধের উর্বর ভিত্তি ভূমি তৈরী করছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে একজন মোহনীয় নেতার আভির্ভাব ঘটে, নাম তার কার্টিস এভার্ট। চেরিস  সামনের দিক থেকে একজন অজ্ঞাত নামা রহশ্যময় মানুষের একটি বার্তা পেয়ে বিদ্রোহের পরিকল্পনা করছে । তাদের ভেতর থেকে একজন খাদ্য বিতরনকারী এই বার্তাটি  গোপনে ছড়িয়ে দেয়। পেছন দিকের  সকল দরিদ্র যাত্রী যে খাবার পায় তাতে পোকামাকরের মিশ্রন থাকে, তা মান সম্মত খাবার ও নয় ।

এই ফিল্মে রেলগাড়ির পিছনের যাত্রীদের সাথে সামনের দিকের যাত্রীদের দ্বন্দ্ব ও পিছরের যাত্রীদের মাঝে বিক্ষোভের জন্ম দেবার প্রায়স আছে।  বিক্ষোভের আগুন একটি গাড়ী থেকে অন্য গারীতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। আমরা দেখতে পেলাম ডিস্টোপিয়ান সমাজে কি ভাবে অন্যায়ের বিষয় গুলো স্পস্ট হয়ে উঠে। আমরা দেখলাম বিদ্রোহীরা গাড়ীর নিয়াপত্তা কর্মীদের সকল অস্ত্র সস্ত্র ফেলে দিলো, যা আজকের সন্ত্রাস বিরোধী আন্দোলনের প্রতিফলন স্পস্ট হয়ে উঠলো। বিদ্রোহীরা ছোড়ে ফেলে দিলো সকল প্রপাগান্ডার যন্তপাতি ও শিশুদের বেইন ওয়াসের মেষিনারিজ। বিদ্রোহীরা কৃষি ও পানির কামরার দিকে এগুতে লাগল। যাত্রীরা ক্রমে সম্পদশালীদের দিকে এগুতে লাগলো। সামনের পানে ধাবিত হলো। যেখানে শরীর চর্চা, আনন্দ ক্লাব, সুন্দর সুন্দর ফার্নিচার দিয়ে সাজানো আঙ্গীনায় উন্নত মদের আড্ডা বিদ্যমান। আসলে সেই স্থানটি হলো ক্ষমতার উৎস। মি. চেরীসের দ্বন্দ্ব উপস্থিত হলো মি. উইল ফোর্ডের সাথে যিনি সেই পবিত্র “ইঞ্জিনটি” নিয়ন্ত্রন করছেন। যেখান থেকে সকল ক্ষমতা নির্গত হয়। শুরু হলো রেলগাড়ীর সামনের ও পিছনের যাত্রীদের মাঝে লড়াই। মরন পন যুদ্ব।

কুখ্যাত সেই যুদ্বের পর অনেক যাত্রী মারা গেল, শুরু হলো নির্বাহী চেরীস ও একনায়ক মি. উইল ফোর্ডের সাথে বিবাদ। তবে মি. উইল ফোর্ড কশাই ছিলেন না, তিনি শত্রু ও ছিলেন না । তিনি বরং একজন প্রবীন, সাধারন, বন্দ্বু সুলভ মানুষ হিসাবে পরিচিত ছিলেন। মি. উইল ফোর্ড মি.চেরীসকে কাবারের জন্য নিমন্ত্রন করলেন। মি. উইল ফোর্ড হিটলার হিসাবে পরিগনিত না হয়ে তিনি দরিদ্র মানুষের বন্দ্বু হিসাবে বিবেচিত হয়ে উঠলেন। মি. উইল ফোর্ড একজন আমলার মত আচরন করতে লাগলেন, তিনি তার কাজ কে যৌক্তিক প্রমানের চেস্টা করেন। তিনি প্রমান করতে চাইলেন যে তিনি ভয়ঙ্কর কোন শয়তান নন। শয়তানের ছড়ানো বিষ। তিনি বলতে চাইলেন যে তিনি কেবল তার দায়িত্ব পালন করছেন।  তিনি তার বক্তব্যে বললেন যারা রেলগাড়ির পেছনে আছেন তারা তার নিকট সমান গুরুত্বের অধিকারী। একটি দৃশ্যে দেখানো হয়েছে যে রেলগাড়িটির পেছনে রয়েছে কিছু গোপনীয় বস্তু। সেখানে শিশুরা কাজ করছে, নানা প্রকার যন্ত্রপাতি ও কুলাহলময় পরিবেশ। আরো দেখানো হয়েছে শিশুরা শ্রম দিচ্ছে শিল্পের বিকাশ ও সাম্রাজ্যবাদের জন্য। মার্ক্স যেভাবে বলেছিলেন শোষণ বঞ্ছনার ভেতর দিয়েই সাম্রজ্যবাদের বিকাশ হয়ে থাকে। যেখানে প্রথম বিশ্ব তৃতীয় বিশ্বকে নিপিড়ন ও শোষণ করে থাকে। পুঁজিবাদ অধিক মুনাফার জন্য সকল কিছুকেই বৈধ মনে করে ।

মি. উইল ফোর্ড দর্শকদেরকে অবাক করে দেন আরো একটি চমৎকার দৃশ্য দেখিয়ে। তিনি দেখান যে, রেলগাড়ির ভেতরেই খাদ্যের পরিবেশক গোপনে বিপ্লবী বার্তা প্রেরন করে বিদ্রোহকে উস্কে দিচ্ছেন। তিনি দেখান তার গাড়িটি ও পরিবেশ বান্দ্বব। মি.উইল ফোর্ড দেখান যে রক্তক্ষরন চলছে তা ম্যালতুসিয়ান অধিক জনসংখ্যার বিষয়টি সমাধান করতে। এই ক্ষেত্রে, মি. উইল ফোর্ড জানালেন সুনির্দিস্ট ঘটনায় এক এক জন মানুষ বিখ্যাত হয়ে উঠেন। তিনি বিপ্লবী ঐতিহ্য ও তুলে ধরেন। তিনি বিপ্লবের নায়ককে বলেন নির্বাচন করন আপনি বিপ্লব চান, নাকি সংস্কার চান? নায়ক, গভীর ভাবে চিন্তা করেন, তিনি লেনিনের সমালোচিত বুর্জোয়া সংস্কারের বিরুধিতা করার মনস্থির করেন। লেনিন বুঝতে পেরেছিলেন কেবল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করলেই বিপ্লব হয় না। বরং প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা, পুরাতন ক্ষমতা কাঠামো, দিয়ে সত্যিকার কোন মুক্তি আসবে না । বরং পুরাতন রাষ্ট্র ব্যবস্থা দরিদ্র মানুষের নিপিড়নের হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে। প্রকৃত বিপ্লবের জন্য পুরাতন শক্তির বিনাশ সাধন ও উচ্চ স্তরের কিছু লোকের পরিবর্তনই সকল সমস্যার সমাধান নয় । যত দিন পর্যন্ত উৎপাদন শক্তি নিপিড়ন কারীদের হাতে থাকবে ততদিন দরিদ্র জনগণকে সমাজ পরিচালনার আসনে বসানো যাবে না । তাই বিপ্লবী অস্ত্র পাচার করে সমাজের সকল গলিত দ্রব্যকে নির্মূল করতেই হবে। শ্রেনী সংগ্রামকে পরিচালনা করে পুরাতন সমাজ ব্যবস্থাকে ধবংস করে নতুন এক সমাজ বিনির্মান করতে হবে। এই ক্ষেত্রে নায়ককে অবশই এই রেলগাড়ির বিনাশ করতে হবে। কেনননা নতুন সমাজের জন্য বর্ত্তমান সমাজকে বিনাশ করতেই হবে। সেই বৈপ্লবিক পরবর্তনের জন্য যে ঝুকি নিতে হবে সেই ঝুকিতে যারা বেচে থাকবেন তাদের ভাগ্যে কি ঘটবে তা কিন্তু আমরা জানিনা । শত ত্যাগ তিতিক্ষা সত্বেও  নায়ক কিন্তু সেই বিপ্লবেরই সিদ্বান্ত ই গ্রহন করেছেন। এই ভাবে ফিল্ম টি বিপ্লবী শ্লোগান তোলেছে, “ আমরা আমাদের জীবন বাজি রেখে বিপ্লবের পানে এগিয়ে যাচ্ছি”। যা হবে আলোকিত সাম্যবাদের বিপ্লব। বিপ্লব মানেই হলো জীবনের ঝুকি নেয়া । বিপ্লব মানে কিন্তু জনগণের মাঝে কেবল বেচে থাকা নয়, বরং জন্তার জন্য জীবন বাজি রাখা। আলোকিত সাম্যবাদি হয়ে উঠতে হয়। ভ্যান গার্ড হয়ে ঊথতে হয়। এর মানে হলো রাজনীতির দায়িত্ব নিজের কাধে তোলে নিতে হবে । রাজনৈতিক শিক্ষা গ্রহন করতে হবে। এই ফিল্মে এই সকল বিষয়াদিই তুলে ধরা হয়েছে । ইহা সকলেরই একবার দেখা দরকার । 

Share on Twitter Share on Facebook

Comments